Wednesday, April 24, 2013

রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ,সুন্দরবন, পরিবেশ আর আমার EIA বিশ্লেষণের চেষ্টা


সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে হুট করেই অনেক আলোচনা শুরু হল দুদিন আগে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর কিছুতা ব্যক্তিগত কারণে আর অনেকখানি সুশীলতা দেখানোর কারনে প্রথমে বিষয়টা আমলেই নেই নাই। গতকাল সমস্যাটা কোথায় দেখার জন্য যখন একটু একটু পড়া শুরু
করলাম তখন বুঝতে পারলাম সমস্যাটা আসলে নিজেদের ( হুম নিজেদেরই, সুন্দরবন আমাদের বাইরের কেউ না) অস্তিত্ব নিয়েই। নেট ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে এই প্রজেক্টের পরিবেশগত বিশ্লেষণ পাওয়া গেলো PDB এর সাইটে কিন্তুFinal Report on Environmental Impact Assessment (EIA) of 2 × (500-660) MW Coal Based Power Plant to be constructed at the location of Khulnaনামক প্রায় ৪৫০ পাতার এই বিশ্লেষণ ভালো করে বোঝার সামর্থ্য আমার নাই। তারপরও প্রায় একদিন ধরে পড়ে বোঝার কিছু চেষ্টা করলাম। যেহেতু আমি এই বিষয়ে কোন এক্সপার্ট কেউ না কাজেই ভুল বোঝার ভালোরকম সম্ভাবনা আছে। তারপরও নিজের কাছে সমস্যা মনে হয়েছে এমন বিষয়গুলো নিয়ে কিছু না করে বসে বসে সুন্দরবনের ধংস দেখা সম্ভব না বলে লিখতে বসেছি।
মুল রিপোর্টটা নিয়ে কথা বলার আগেcoal based thermal power plantএর কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করে নেয়া আমার জন্য ভালো মনে হচ্ছে কারন , আমি নিজেই গত দুইদিনে এই বিষয়গুলো জেনেছি।

কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র কি ?
          খুব সোজা , এই ধরণের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা পুড়িয়ে তাপ তৈরি করে সেই তাপে পানি বাষ্পীভূত করে সেই বাষ্প দিয়ে টার্বাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়। চিমনি দিয়ে কয়লা পুড়ানোর ফলে উৎপন্ন গ্যাস বের হয়ে যায় আর কাছাকাছি কোন জলাধার থেকে পানি এনে condenser এর কাজ চালানো হয়।
আরও ভালো করে বোঝার জন্য এখানে ভিডিও দেখা যাবে আর রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ডিজাইন এর ছবিটা দেয়া হল এখানে।

কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুবিধা কি ?
নেটে সার্চ দিলে সবচেয়ে প্রথমে এবং সবচেয়ে বেশিবার যেই সুবিধার কথা জানা যায় সেটা হচ্ছেসস্তা
কেন সস্তা ?
 কারন অন্যান্য জ্বালানী থেকে কয়লা অনেক বেশী সহজলভ্য। পৃথিবীর প্রায় ৭০ টা দেশে কয়লার ভালোরকম মজুদ আছে। পৃথিবীতে প্রায় ২০০ বছরের কয়লা মজুদ আছে বলে জ্বালানী তেল এর মতো কয়লার নিয়ে রাজনীতি হয় খুব কম, দামও কম
এর বাইরেরও কিছু কারন আছে সস্তা হওয়ার
. কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানানও যায় অনেক কম খরচে

. প্রায় ৮০% কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দিনরাত ২৪ ঘণ্টা চলতে পারে কোন সমস্যা ছাড়া।

. কয়লা পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেই পাওয়া যায় বলে পরিবহন খরচ অনেক কম হয়।

তাহলে অসুবিধা ?
          পরিবেশগত দিক বাদ দিলেও কয়েকটা অসুবিধা আছে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের
        ১. জ্বালানী হিসেবে কয়লা খুব একটা ভালো না। সমপরিমাণ গ্যাস কিংবা জ্বালানী তেল এর থেকে অনেক কম শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।
        ২. কয়লার ধুলা থেকে বড় ধরণের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে তাই সবসময় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হয়। যদিও বাংলাদেশে কোথাও সেরকম কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে নাকি আমি জানি না

এইবার আসা যাক EIA রিপোর্ট পড়তে পড়তে কোন কোন বিষয় সুন্দরবন এর জন্য বিপদজনক মনে হয়েছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা

. দূরত্বঃ 
       সবার প্রথমেই যেই জিনিসটা নিয়ে ঝামেলায় পরলাম সেটা হচ্ছে সুন্দরবন থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূরত্ব কতো ? রিপোর্টে লেখা সংরক্ষিত বন থেকে ১৪ কিলোমিটার আর সংরক্ষিত বনের বাইরের পরিবেশগত সংকটপূর্ণ এলাকা থেকে কিলোমিটার, কাজেই কোন চিন্তা নাই, থাকার কথাও না কিন্তু ঝামেলা করলো আরেকটু পর যখন সারা রিপোর্ট জুড়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রর চারপাশের ১০ কিলোমিটারকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ক্রিটিকাল এরিএ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ সুন্দরবনের পরিবেশগত সংকটপূর্ণ  প্রায় কিলোমিটার এলাকা অভারলেপ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের  সংকটপূর্ণ এলাকার সাথে এর বাইরেরও একজায়গায় লেখা এখনকার প্রকল্পের এলাকাটা সুন্দরবনেরই অংশ মানুষ গাছ কেটে বসতি স্থাপন করেছে। এতো কম দূরত্ব কি কোন প্রভাবই ফেলবে না সুন্দরবনে নাকি ১৪ কিলোমিটার এর হিসাব আলাদাভাবে দেয়াটা কোন ফাঁকি ?
. সময়ঃ 
       বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির সময় ধরা হয়েছে বছর ( দ্বিতীয় ইউনিট সহ . বছর) আর কাজের সময় ধরা হয়েছে ২৫ বছর অর্থাৎ ২৯ বছর এর জন্য রামপালে এই প্রকল্প। এখন ২০১৩ সাল কিন্তু প্রকল্প এলাকার তাপমাত্রা , বৃষ্টিপাত , নদীর পানিপ্রবাহ সহ কয়েকটা বিষয়ে ২০০৮ কিংবা তার আগের তথ্য নিয়ে কাজ করা হয়েছে। যদি ২০১৩ তেই কাজ শুরু হয় তাহলে আগামী ২৯ বছরে কি এইসব বিষয়ে কোন পরিবর্তনই হবে না ?

. বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানানোর সময়ে সম্ভাব্য বিভিন্ন ক্ষতিঃ
          রিপোর্টে কেন্দ্র বানানোর সময়ে প্রভাব পরতে পারে এমন ১৪ টা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে , আমি  আমার কাছে দরকারি মনে হওয়া বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম
  • তাপমাত্রাঃ কন্সট্রাকশনের সময় ডিজেল জেনারেটর এর কারণে এলাকার তাপমাত্রা বাড়বে যদিও রিপোর্টে বলা হয়েছেখুব বেশী প্রভাব পরবে নাকিন্তু এই কথা রিপোর্টের সব জায়গাতেই বলা হয়েছে
  • শব্দ দূষণঃ কন্সট্রাকশনের কাজ চলার সময় প্রচুর শব্দ দূষণ হবে। কাজ চলাকালীন শব্দ তো আছেই সাথে বিভিন্ন যানবাহন আসা যাওয়ার কারণে শব্দ দূষণ হবে। মংলা থেকে নদী পথে যদি কোন কিছু আনা হয় তবে জাহাজ যাতায়াত এর কারণে বনের ভিতর শব্দ দূষণ প্রথম থেকেই শুরু হবে।
  • আবর্জনাঃ কন্সট্রাকশনের কাজ চলার সময় প্রচুর আবর্জনা তৈরি হবে কিন্তু সঠিক ভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হবে কিনা সেটা নিশ্চিত ভাবে বলা নেই রিপোর্টে শুধু বলা আছে যদি ভালো মানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হয় তবে তেমন কোন সমস্যা হবে না
  • পানিঃ এই জিনিসটা প্রথম থেকেই বিপদে থাকবে।

       প্রথমত নির্মাণ কাজ চলার সময় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি , যানবাহন, জাহাজ এর থেকে বর্জ্য, জ্বালানী তেল পানিতে পরে পানি দূষণ করবে।
      দ্বিতীয়ত, প্রচুর শ্রমিক এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজে থাকবে তাদের কারণে পানি দুষিত হবে
      তৃতীয়ত, ড্রেজিং এর কারণে নদীর পানি ঘোলা হয়ে যাবে এবং ঠিকভাবে ড্রেজিং না করতে পারলে তেল , গ্রিজ এইশব নদীর পানিতে মিশে পানি আরও দুষিত করবে। ড্রেজিং করা মাটি বিভিন্ন ভাবে নদীতে গিয়ে পরলে নদীর পানি আরও ঘোলা হবে।
          এখানে একটা জিনিস দেখার বিষয়, নদীর পানি ঘোলা হলে সমস্যাটা কোথায় সেটা বুঝতে অনেক সময় সমস্যা হয় ( আমি নিজেই প্রথমে বুঝি নাই) আসলে বিষয়টা হচ্ছে সুন্দরবনের আশেপাশের এই এলাকাগুলো মাছের বড় একটা ভাণ্ডার। পানি ঘোলা হলে মাছের স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থা বিনষ্ট হবে। শুধু প্রকল্প এলাকাতেই হবে তাই না যেহেতু এখানকার পানিই সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হবে কাজেই সুন্দরবনের জলজ প্রাণীদেরও জীবন ব্যবস্থায় সমস্যা হবে। এর বাইরে প্রকল্প এলাকার আশেপাশে প্রচুর চিংড়ি ঘের আছে সেগুলোর জন্য নদীর পাশের ম্যানগ্রোভ বনের সারির জন্য স্বাভাবিক এর চেয়ে বেশী ঘোলা পানি ভালো হওয়ার কথা না।
  • নৌপথঃ প্রচুর বাহন চলাচলের কারণে আশেপাশের সব নৌপথ আর পার্শ্ববর্তী বন বসতিতে প্রভাব পরবে। এছাড়া রিপোর্টেই আশংকা করা হয়েছে নৌ দুর্ঘটনা বাড়বে
  • কৃষিঃ প্রকল্পের জন্য প্রায় ১৮৩৪ একর কৃষি বসতি জনি অধিগ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে কৃষি জমিতে ধান অন্যান্য ফসল হয়। কিছু জমিতে ধান চিংড়ি দুইটাই চাষ হয়। এগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
  • মাছঃ পানি ঘোলা হওয়ার কথা বলতে গিয়ে মাছের কথা একবার বলেছি  এখন আরেকটু আলোচনা করা যাক  
    •   মাছের বাসস্থানঃ প্রকল্পের জন্য যে জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে সেটা মূলত কৃষি জমি , চিংরিঘের, ম্যানগ্রোভ , আন্তঃ জোয়ার এলাকা। ফলে পুরো এলাকাটায় মাছের ও চিংড়ির নিজস্ব একটা জীবনব্যবস্থা আছে। সেটা পুরোপুরি নষ্ট হবে। এছাড়া কন্সট্রাকশনের সময় ড্রেজিং , বালি উত্তোলন ও অন্যান্য কাজের সময় পার্শ্ববর্তী জলাভূমির মাছের জীবনযাত্রা, চলাচল ও প্রজননে ব্যঘাত ঘটবে। যদিও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে কিন্তু সেটা ঠিক ভাবে না করা হলে ক্ষতির পরিমাণ হবে অনেক বেশী। এছাড়া বলা হয়েছে আশেপাশের এলাকায় কোন ক্ষতি হবে না কিন্তু আবার প্রকল্প এলাকায় ড্রেজিং , যানবাহন চলাচল ও বিভিন্ন কাজের কারণে তেল, গ্রিজ ও অন্যান্য রাসায়নিক পশুর মাইদারা নদী , খাল , জোয়ার ভাটার ভলে সাময়িক জলাভুমিতে মিশে দুষিত করবে। প্রশ্ন হচ্ছে এই দূষণ কি শুধুই ঐ এলাকায় বন্দি থাকবে ? পানির সাথে কি ছড়িয়ে পরবে না ?
    • মাছের চলাচলের রুটঃ প্রকল্প এলাকার আশেপাশে তিনটি নদী পশুর, চুনকুড়ি মাইদারা হচ্ছে মাছেদের সাধু পানি - লোনা পানি চলাচলের রুট। খাওয়া ও ডিমপাড়ার প্রয়োজনে ঐ এলাকার মাছেদের এই চলাচলটা খুব জরুরি  কিন্তু অতিরিক্ত নৌযান আর ড্রেজিং এর কারণে এই রুটগুলো দিয়ে মাছের স্বাভাবিক চলাচলে ব্যঘাত ঘটবে। যদিও বলা হয়েছে ড্রেজিং এর সময় শুধু ড্রেজিং করার এলাকায় সমস্যা হবে , প্রশ্ন হচ্ছে একটা পথের মাঝ বরাবর বাঁশ ফেলে বাধা তৈরি করে রেখে অন্য কোন জায়গায় কোন বাধা নেই তাই চলাচলে কোন সমস্যা হবে না বলা কতোটা যুক্তিসঙ্গত ?
    • প্রজননঃ শুধু মাত্র ভুমি অধিগ্রহণ করার কারনেই চিংড়ি প্রজননে বড় ধরণের প্রভাব পরবে , বছরে প্রায় ৫৬৪ টন করে চিংড়ি উৎপাদন হবে না। এছাড়া যদিও বলা হয়েছে আর কোন সমস্যা হবে না কিন্তু নদীতে নৌযান এর পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, দূষণ ইত্যাদি কারণে কি কি প্রভাব পরতে পারে সেটা নিয়ে কোন আলোচনাই করা হয় নাই। 
(চলবে) 

কিছু জিনিস বোঝার জন্য এই নোট এর সাহায্য নেয়া হয়েছে । কিন্তু সব তথ্য EIA রিপোর্ট থেকে নেয়া। 

No comments :

Post a Comment