Tuesday, February 28, 2017

শুকনো কবির লেখা - শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ সে না হয় জলকাতুরে। বৃষ্টি হলেই ছাতা
একটা সময় ছিল, যখন ভেজাত কলকাতা

জলের তোড়ে ভেসেও যেত, কলম-ধরা হাতে
কবিতাছাঁট পাঠিয়ে দিত জানলাতে জানলাতে...

আজ সে না হয় বাজার-ফেরত। ক্লান্ত ক্যারি ব্যাগে।
একদিন সব ভোগ করেছে, মন ছিল না ত্যাগে।

বৃষ্টিভেজা শহরটাকে নিংড়ে নিয়ে ভিজে
রাখাল হয়ে মেঘ চরাত ফুটপাথে আর ব্রিজে!

আজ সে না হয় শুকনো কবি। আখর কাটে ধুলোয়।
এখনও মেঘ ডাকছে তার আগের লেখাগুলোয়...

Sunday, December 18, 2016

জাতীয় কবিতা উৎসবের ইতিহাস

১৯৮৭ সালের কথা, স্বৈরাচার এরশাদ তখন ক্ষমতায়। রাষ্ট্রীয় ভাবে কবি এরশাদের প্রচার প্রচারনার চলে। ভন্ড কবি এরশাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তখন সৈয়দ আলী আহাসান, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দিনের কবিরা। ফজল শাহাবুদ্দিন আবার ছিলেন সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক। তখন নাকি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রতি সপ্তাহে এরশাদের একটা করে কবিতা প্রকাশিত হত। তার ইচ্ছাতেই তৈরি হল "কবিতা কেন্দ্র" সেখান থেকেই এরশাদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজন করা হল "এশীয় কবিতা উৎসব"।
অন্যদিকে স্বৈরাচার বিরোধী কবিদের নিয়ে গঠিত হল জাতীয় কবিতা পরিষদ। সেসময় দৈনিক বাংলা থেকে পদত্যাগ করে কবি শামসুর রাহমান যোগ দেন জাতীয় কবিতা পরিষদে। সাথে থাকেন সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, ড. হুমায়ুন আজাদ, বেলাল চৌধুরী, লুৎফর রহমান সরকার,নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সহা, হায়াৎ মাহমুদ, রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সহ আরও অনেকে।
১৯৮৭ এর ৩১ জানুয়ারী থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এশীয় কবিতা উৎসব। তিনদিন ব্যাপী এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় ওসমানী স্মৃতিমিলনায়তনে। রাষ্ট্রপতি এরশাদই ছিলেন এ উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অন্যদিকে ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সড়কদ্বীপে হয় জাতীয় কবিতা উৎসব। কবি শামসুর রাহমানের সভাপতিত্বে কবি বেগম সুফিয়া কামাল উৎসবের উদ্বোধন করেন।
জাতীয় কবিতা পরিষদ আর জাতীয় কবিতা উৎসব দুইটাই টিকে আছে ৩০ বছর ধরে। রাষ্ট্রীয় ভাবে লাখ লাখ টাকা খরচ করেও এশীয় কবিতা উৎসব দুইবারের বেশি করা সম্ভব হয় নাই। কবিতা কেন্দ্র আর ফজল শাহাবুদ্দিনের কথা আমি জানলামই ইতিহাস পড়তে গিয়ে।

দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে
দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে

'দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে' এই স্কেচটি পটুয়া কামরুল হাসানের শেষ শিল্পকর্ম। ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় জাতীয় কবিতা উৎসবে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত থাকাকালীন সময়ে মঞ্চে বসে এটি আঁকার কিছুক্ষণের মধ্যেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।

Tuesday, November 15, 2016

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি - আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। 
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল 
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল। 

তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন 
অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন 
পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন 
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন। 

জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা, 
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা। 
যে কবিতা শুনতে জানে না 
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে। 
যে কবিতা শুনতে জানে না 
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। 
যে কবিতা শুনতে জানে না 
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে। 

Tuesday, August 30, 2016

কফিন কাহিনী - মহাদেব সাহা

চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে রঙিন
রক্তমাখা জামা ছিলো হয়ে গেছে ফুল
চোখ দুটি মেঘে মেঘে ব্যথিত বকুল!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে এক শবদেহ
একজন বললো দেখো ভিতরে সন্দেহ
যেমন মানুষ ছিলো মানুষটি নাই
মাটির মানচিত্র হয়ে ফুটে আছে তাই!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি শরীর
একজন বললো দেখো ভিতরে কী স্থির
মৃত নয়, দেহ নয়, দেশ শুয়ে আছে
সমস্ত নদীর উৎস হৃদয়ের কাছে!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে নবীন
হাতের আঙুলগুলি আরক্ত করবী
রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি!

Sunday, June 26, 2016

উত্তরাধীকার - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

নবীন কিশোর
তোমাকে দিলাম ভুবনডাঙ্গার মেঘলা আকাশ
তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট
আর ফুসফুস ভরা হাসি
দুপুর রৌদ্রে পায়ে পায়ে ঘোরা
রাত্রীর মাঠে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা।
এসব এখন তোমারই

Wednesday, February 10, 2016

মাতৃভাষা – আবুল হাসান

আমি জানিনা দুঃখের কী মাতৃভাষা
ভালোবাসার কী মাতৃভাষা
বেদনার কী মাতৃভাষা
যুদ্ধের কী মাতৃভাষা।

আমি জানিনা নদীর কী মাতৃভাষা
নগ্নতার কী মাতৃভাষা
একটা নিবিড় বৃক্ষ কোন ভাষায় কথা বলে এখনো জানিনা।

শুধু আমি কোথাও ঘরের দরোজায় দাঁড়ালেই আজো
সভ্যতার শেষ মানুষের পদশব্দ শুনি আর
কোথাও করুণ জল গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে,
আর সেই জলপতনের শব্দে সিক্ত হতে থাকে
সর্বাঙ্গে সবুজ হতে থাকে আমার শরীর।

সর্বাঙ্গে সবুজ আমি কোথাও ঘরের দরোজায় দাঁড়ালেই আজো
পোষা পাখিদের কিচিরমিচির শুনি
শিশুদের কলরব শুনি
সুবর্ণ কঙ্কন পরা কামনার হাস্যধ্বনি শুনি !

ঐযে নষ্ট গলি, নিশ্চুপ দরোজা
ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা, গণিকারা-
মধ্যরাতে উলঙ্গ শয্যায় ওরা কীসের ভাষায় কথা বলে ?

ঐযে কমলা রং কিশোরীরা যাচ্ছে ইশকুলে
আজো ঐ কিশোরীর প্রথম কম্পনে দুটি হাত রাখলে
রক্তে স্রোত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে, শব্দ হয়, শুনি

কিন্তু আমি রক্তের কী মাতৃভাষা এখনও জানিনা !

বেদনার কী মাতৃভাষা এখনো জানিনা !

শুধু আমি জানি আমি একটি মানুষ,
আর পৃথিবীতে এখনও আমার মাতৃভাষা, ক্ষুধা !